সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২: জমি ও সম্পদ হস্তান্তরের সহজ নিয়মাবলী


সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২: জমি ও সম্পদ হস্তান্তরের সহজ নিয়মাবলী


সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২: জমি ও সম্পদ হস্তান্তরের সহজ ও নির্ভরযোগ্য নিয়মাবলী

আমাদের বাংলাদেশে যে কোনো  সম্পত্তি তা স্থাবর হোক বা অস্থাবর হোক হস্তান্তরের সময়  আইনের মূল ভিত্তি হিসেবে  সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ কাজে লাগে । জমি জমা কেনা বা বেচা , দান, বন্ধক কিংবা লিজ গ্রহণের সময় আইনি জটিলতা এড়াতে এই সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২: জমি ও সম্পদ হস্তান্তরের সহজ নিয়মাবলী জেনে রাখা আমাদের দরকার । কারণ সঠিক আইন অনুসরণ না করলে ভবিষ্যৎ মালিকানা নিয়ে বড় ধরনের মামলার  ঝুঁকি  থাকে ।

এই লেখায় আমরা সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের মূল বিষয়গুলো সহজ  ভাষায় ব্যাখ্যা করব   যা আপনাকে নিরাপদে সম্পত্তি লেনদেনে সাহায্য করবে।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ কী?

সহজ কথায়, যে আইনের মাধ্যমে কোন জীবিত ব্যক্তির  কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানা  অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হয়, তাকে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ বলা হয়।

এই আইনের  প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলি:

শুধুমাত্র জীবিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন :


সম্পত্তির উইল করা বা উত্তরাধিকার ক্ষেত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি এসব বিষয় এই আইনের অন্তর্ভুক্ত নয় কেননা এসব  বিষয়ের আইন গুলি ব্যক্তির মৃত্যুর পর কার্যকর হয় ।

স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি:

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ মুলত তৈরি করা হয়েছে স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে তবে অস্থাবর সম্পত্তির কিছু বিষয় এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে


কারা কারা সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবেন :


যেকোনো ব্যক্তি চাইলেই যে কোন সম্পত্তি হস্তান্ত করতে পারবে না আইন অনুযায়ী সম্পত্তি হস্তান্তরকারীর ও সম্পত্তি গ্রহণকারীর কিছু যোগ্যতা থাকতে হয় ও শর্ত পূরণ করতে হয়।

আইনগত যোগ্যতার তালিকা

হস্তান্তরকারীর যোগ্যতা: 

আইন অনুযায়ী সম্পত্তি হস্তান্তকারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে এবং সম্পত্তি হস্তান্তকারীকে অবশ্যই সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী ব্যক্তি হতে হবে ।

মালিকানা বা আইনি ক্ষমতা:

সম্পত্তি হস্তান্তর  কারি বা বিক্রেতা যে জমি বিক্রি করবে ঐ  জমির উপর তার পূর্ণ মালিকানা থাকতে হবে এবং বিক্রি করার পূর্ণ ক্ষমতা থাকতে হবে। 

 হস্তান্তর করা যায় এমন সম্পত্তি: 

সম্পত্তি হস্তান্তর কারী  বা বিক্রেতা কে ঐ  সম্পত্তি হস্তান্তর করতে হবে যে সম্পত্তি তিনি হস্তান্তর করতে পারেন অর্থাৎ যে সম্পত্তি হস্তান্তর করা যায় ঐ  সম্পত্তি হস্তান্তর করতে হবে । 

জমি  জমা ও সম্পদ  ৫টি পদ্ধতি তে হস্তান্তর করা  যায়

১৮৮২ সালের আইন অনুযায়ী ৫টি আইন গত পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তর করা যায় :


১ | বিক্রয়ের মাধ্যমে হস্তান্তর 

ধারা ৫৪ অনুযায়ী,  নগদ টাকার বিনিময়ে সম্পত্তি হস্তান্তর  করাকে বিক্রয় বলে  ।

সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আইন বা নিয়ম:


প্রথমে সম্পত্তি বিক্রির জন্য একটা বায়না দলিল করা হয় উক্ত বায়না দলিলে উল্লেখ থাকে এই যে দাতা তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে গৃহীতাকে বা গৃহীতার নামে সম্পত্তির রেজিস্ট্রি করে দেবে এবং বাংলাদেশে  রেজিস্ট্রি আইন ১৯০৮  এর নিয়ম অনুযায়ী ১০০ টাকা মূল্যের যে কোন স্থাপক সম্পত্তি অবশ্যই দলিলের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করতে  হবে ।

২ | দানের মাধ্যমে জমি জমা হস্তান্তর 

ধারা ১২২ অনুযায়ী, কোনো ধরনের টাকা-পয়সা ছাড়া কোন ব্যক্তি যখন তার কোন বিকট আত্মীয়কে সম্পত্তি হস্তান্তর করে তখন তাকে দানের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর বলে  ।

দানের ক্ষেত্রে অবশ্য করণীয় উপাদান:

দাতা ও গ্রহীতা:

দান দাতা  গৃহিতা বরাবর দান করবে এবং গৃহীত উক্ত দান গ্রহণ করে সম্পত্তির দখল বুঝে নেবে

দানের সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করাবাধ্যতামূলক: 

২০০৭ সালের ভূমি রেজিস্ট্রি সংশোধন আইন অনুযায়ী, যেকোনো দান দলিল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক। রেজিস্ট্রিবিহীন কোন দান আইনের চোখে মূল্যহীন । 

৩| বন্ধকের মাধ্যমে হস্তান্তর 

ধারা ৫৮ অনুযায়ী, কোন ব্যক্তি কিছু নগদ টাকার বিনিময়ে তাহার সম্পত্তি অন্য কোন ব্যক্তির নিকট  ঐ টাকার বিনিময়ে জামানত রাখে আর এই রাখাকে  বন্ধক বলে।

বন্ধকের প্রকার:

সাদা বন্ধক : 

যার কাছে সম্পত্তি বন্ধক দেয় তাকে সম্পত্তিতে দখল দেওয়া হয় না শুধুমাত্র তার টাকার নিশ্চয়তার জন্য তার কাছে সম্পত্তি বন্ধক দেওয়া হয়।

দখলী বন্ধক :

ঋণদাতা বা যার কাছ থেকে সম্পত্তি বন্ধকের বিনিময়ে নগদ টাকা আনা হয় তার কাছে সম্পত্তির দখল ছেড়ে দিতে হয় এবং সম্পত্তি  থেকে প্রাপ্ত আয় (যেমন ভাড়া বা ফসল) ঋণ পরিশোধে জন্য জমা করা হয়।

দলিল জমা রেখে বন্ধক : 

এক্ষেত্রে ব্যক্তি ব্যাংকে তার মূল দলিল জামানত হিসেবে  জমা রেখে ব্যাংক থেকে লোন গ্রহণ করে।

৪ |  ইজারা বা লিজ 

ধারা ১০৫ অনুযায়ী, কোন ব্যক্তিনির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট ভাড়ার বিনিময়ে তার সম্পত্তি অন্যকে ব্যবহারে অনুমতি দেওয়া কে নিজের  ইজারা বলে 

লিজের জরুরি বিষয়গুলো:

আমাদের দেশে চলমান নিয়ম অনুযায়ী যখন কোন জমির  মূল মালিকানা বদল হয় না   শুধুমাত্র ব্যবহারের অধিকার একজনের হাত থেকে অন্যজনের হাতে স্থানান্তরিত  হয় এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হলে সম্পত্তি পুনরায় মূল মালিকের দখল বা ব্যবহারে উপযোগী হয়ে আসে ।

৫। সম্পত্তি বিনিময়

ধারা ১১৮ অনুযায়ী, যখন দুই ব্যক্তি নিজেদের সুবিধার জন্য এবং নিজেদের  সম্মতিতেই একজন তার নিজের সম্পত্তিতে অন্যজনকে দখল ও  রেজিস্ট্রি করে দেয় আবার অন্যজন ও তার নিজের সম্পত্তিতে অপরজনকে দখল ও রেজিস্ট্রি করে দেয় । উদাহরণ স্বরূপ আমি বলতে পারি যে  , রহিম মিয়া ও  করিম মিয়া দুই ব্যক্তি  তাদের সম্পত্তি এওজ বদল রেজিস্ট্রি করবে অর্থাৎ রহিম মিয়ার  সম্পত্তি করিম মিয়ার নামে দিবে , আবার করিম মিয়ার সম্পত্তি রহিম মিয়ার নামে দিবে তবে এক্ষেত্রে রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক । 

সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলতে হবে

জমি ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক লেনদেনের পূর্বে নিচে বর্ণিত বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করতে হবে:

সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান যাচাই:

যিনি সম্পত্তি বিক্রি করবেন বা সম্পত্তির মালিক তার নামে সম্পত্তিতে রেকর্ড হয়েছে কিনা এবং   ওয়ারিশ সূত্রে মালিক হলে তার পূর্ববর্তী পুরুষের নামে ঐ  সম্পত্তিতে রেকর্ড আছে কিনা তা দেখতে হবে  । এবং  বর্তমানে তার নামে নাম পত্তন করানো আছে কি না এবং সর্বশেষ বছরের খাজনা রশিদ আছে কি না তাহা  যাচাই করতে হবে । 

পিঠ দলিল  পরীক্ষা:

বর্তমান সম্পত্তির মালিক যিনি সম্পত্তি হস্তান্ত করবেন তিনিই সম্পত্তি কিভাবে পেয়েছেন তা  দেখার জন্য মালিকের সম্পত্তির পিঠ দলিল / বায়া দলিল যাচাই বাছাই করে দেখতে হবে।

দখল যাচাই: 

সরজমিনে গিয়ে দেখতে হবে যে সম্পত্তি যিনি বিক্রি করতে চান তার দখলে ঐ সম্পত্তিটি আছে কিনা ।

ভারমুক্ত সনদ : 

সাব-রেজিস্ট্রি অফিস গিয়ে  তল্লাশি দিয়ে দেখতে হবে যে জমিটি অন্য কারো কাছে  হস্তান্তর বা বায়না করেছে কিনা তা ভালোভাবে যাচাই করে দেখতে হবে ।

বিশেষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই পরামর্শ দিচ্ছি :


যিনি জমি রাখবেন বা সম্পত্তিক ক্রয় করবেন তাকে সম্পত্তি রেজিস্টির সময়   রেজিস্ট্রি ফি, স্ট্যাম্প ডিউটি, এবং উৎস কর সঠিকভাবে সরকারি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে প্রদান করতে হবে । এবং দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পর রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিলের সই -মহর কপি তুলে স্থানীয় থানার বা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসে মাধ্যমে সরকারি বালামে পূর্ববর্তী মালিকের নাম কর্তন করে নিজ নামে রেকর্ড লেখাতে হবে যাকে বলে নামপত্তন আর যত দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্ভব এই নাম পত্তন করতে হবে । কেননা  নাম পত্তন ছাড়া জমির উপর নিজ নামে খাজনা দেওয়া যায় না এবং জমির পরিপূর্ণ আইনি মালিক হওয়া যায় না ।

 তবে আমরা সবাই নিরাপদ জমিজমা ক্রয় বিক্রয়ের জন্য একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর বা অভিজ্ঞ দলিল লেখক বা সাব -রেজিষ্টরের পরামর্শ নিব ।

কিছু সাধারন জিজ্ঞাসা বা (FAQ)

১ | মৌখিকভাবে জমি জমা বেচা কেনা করলে তার কি কোন আইনি বৈধতা থাকবে ?

উত্তর: না। ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ও ও জমিজমা রেজিস্ট্রি আইন অনুযায়ী সকল ধরনের স্থাবর  ও  অস্থাবর সম্পত্তি কাউকে হস্তান্তর করতে হলে অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে রেজিস্ট্রি দলিল ছাড়া কাউকে জমি দিলে আইনগতভাবে তার কোন বৈধতা থাকে না ।

২| নাবালকের নামে কি জমি জমা ক্রয় করা যায়?

উত্তর: নাবালকের নামে জমিজমা ক্রয় করা বা নাবালকের নামে সম্পত্তি দান করা যায় এবং নাবালক তা গ্রহণ করতে পারে। তবে নাবালক নিজে কোনো জমি জমা বিক্রির জন্য রেজিস্ট্রি দিতে পারে না  এ ক্ষেত্রে অভিভাবদের আদালতের থেকে অনুমতি নিয়ে তারপরে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে হবে  । 

৩ ।  যদি কোন বিক্রেতা জমি বিক্রির জন্য বায়না পত্র দলিল রেজিস্টি করে দিয়ে পরবর্তীতে জমির দলিল সাব -রেজিস্ট্রি করে দিতে না চায় এক্ষেত্রে করনীয় কি  ? 

 যদি কোন বিক্রেতা জমি বিক্রির জন্য বায়না পত্র দলিল রেজিস্টি করে দিয়ে পরবর্তীতে জমির দলিল সাব -রেজিস্ট্রি করে দিতে না চায় করলে,এক্ষেত্রে ক্রেতাকে  সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন  অনুযায়ী আদালতে চুক্তি বাস্তবায়ন করার জন্য মামলা করতে হবে ।

শেষ কথা

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ খুবই সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক যুগোপযোগী একটি আইনি কাঠামো প্রদান করেছে, যা সাধারণ নাগরিককে সম্পত্তি কেনাবেচার ক্ষেত্রে আইন গত  সুরক্ষা দেয়। জমি বা সম্পদ ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে  তাড়াহুড়া না করে দলিলের সত্যতা যাচাই ও , খতিয়ান এবং মাঠপর্যায়ের দখল আছে কিনা তা যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। জটিল কঠিন আইনগত  প্রশ্নের সম্মুখীন হলে সবসময় একজন অভিজ্ঞ   দেওয়ানি  আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।


Post a Comment

Previous Post Next Post